17/04/2026
"আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে কিছু সত্যের চেয়ে মিথ্যে অনেক বেশি নিরাপদ। যেখানে নিজের প্রকৃত সত্তাকে লুকিয়ে রাখাই হলো 'ভালো মানুষ' হওয়ার প্রথম শর্ত। 'সমকামিতা' এই একটি শব্দ আমাদের ড্রয়িং রুমের আলোচনায় আজও ব্রাত্য।
কিন্তু এই যে নীরবতা, এটি কি শান্তি বয়ে আনে? নাকি হাজারো মানুষের হৃদয়ে এক গুমোট অস্থিরতা তৈরি করে? নীরবতা যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন তা এক অদৃশ্য দেয়ালে পরিণত হয়, যা আমাদের একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
সমকামিতা নিয়ে আমাদের প্রধান ভয়ের জায়গাটি হলো 'লোকলজ্জা'। যদি জানাজানি হয়ে যায়, তবে সমাজ কী বলবে? আত্মীয়-স্বজন কী ভাববে? এই 'কী বলবে'র ভয়েই আমরা বিজ্ঞানের ধ্রুব সত্যকে অস্বীকার করতে শিখি।
সমাজ আমাদের শিখিয়েছে ভালোবাসা কেবল একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে হতে হবে। এই ছাঁচের বাইরে যা কিছু, তাকেই আমরা 'বিচ্যুতি' বা 'অসুস্থতা' বলে গালি দেই। কিন্তু ভালোবাসা কি কোনো ছাঁচে বন্দি করা সম্ভব? নাকি এটি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরের এক অনুভূতি?
মনস্তত্ত্ববিদরা একে বলেন 'ইন্টারনালাইজড হোমোফোবিয়া' অর্থাৎ নিজের পরিচয়কে নিজেই ঘৃণা করতে শেখা। সমাজ যখন আপনাকে ছোটবেলা থেকেই শেখাবে আপনি 'খারাপ', তখন আপনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই অপরাধী মনে করতে শুরু করবেন।
এই মানসিক দ্বন্দ্বের ফলে জন্ম নেয় এক গভীর বিষণ্ণতা। তারা সবার সাথে থেকেও একা। এই একাকীত্ব কেবল শারীরিক নয়, এটি অস্তিত্বের। আপনি কি কোনোদিন ভেবেছেন; একই ঘরে থেকেও কেউ আপনার থেকে যোজন যোজন দূরে থাকতে পারে কেবল তার ভয়ের কারণে?
এই আলোচনায় আমরা সেই ভয়ের মূলে কুড়াল মারব। আমরা দেখব কীভাবে বিশ্বজুড়ে এই শিকল ভাঙার শুরু হয়েছিল। 'বৈচিত্র্য কন্ঠ' আজ নীরবতা ভেঙে সত্য বলার সাহসের গল্প শোনাবে।
আমাদের বাংলাদেশ। একটি বৈচিত্র্যময় দেশ হলেও কিছু বিষয়ে আমাদের নীরবতা পাহাড়সম। এই ভূখণ্ডে সমকামিতা কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ এবং চরম সামাজিক কলঙ্ক।
আইনের বইয়ের পাতা উল্টালে আমরা পাই দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা। ১৮৬০ সালে ব্রিটিশদের তৈরি এই কালো আইন আজও আমাদের বিচারব্যবস্থায় টিকে আছে। যেখানে সমলিঙ্গের যৌন আচরণকে 'অপ্রাকৃতিক' বলে অভিহিত করা হয়েছে।
কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, যে ব্রিটিশরা এই আইন আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল, তারা ১৯৬৭ সালেই একে বাতিল করেছে। অথচ আমরা এক অদ্ভুত মায়ার টানে সেই ঔপনিবেশিক মানসিকতার উত্তরাধিকার বহন করছি।
আইনের চেয়েও ভয়ংকর হলো সামাজিক দণ্ড। আমাদের দেশে একজন মানুষ সমকামী হিসেবে জানাজানি হওয়ার মানে হলো; পরিবার থেকে বর্জন, কর্মক্ষেত্রে হেনস্তা এবং অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়া।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবার থেকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়। একটি মিথ্যে সম্পর্কের জালে আরও একটি নিরপরাধ মানুষের জীবন নষ্ট করা হয়। সামাজিকভাবে 'স্বাভাবিক' সাজার এই অভিনয় এক দীর্ঘস্থায়ী নরকযন্ত্রণা।
আমাদের দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা ট্রান্সজেন্ডারদের সাথে সমকামীদের গুলিয়ে ফেলা হয়। সঠিক যৌন শিক্ষার অভাবে আমাদের সমাজের বড় একটি অংশ জানেই না যে এটি কোনো পছন্দ নয়, বরং এটি একটি ভিন্ন সত্তা।
গণমাধ্যম এবং চলচ্চিত্রেও এদের চিত্রায়ন করা হয় উপহাসের পাত্র হিসেবে। যার ফলে মানুষের মনে এদের প্রতি শ্রদ্ধা বা সহমর্মিতার বদলে কেবল কৌতুক বা ঘৃণার জন্ম নেয়। আমরা কি আসলেই এতটা নিষ্ঠুর?
আমাদের দেশের অনেক মেধাবী তরুণ কেবল এই ভয়ের কারণে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ব্রেইন ড্রেন বা মেধা পাচারের এটিও এক অদৃশ্য কারণ। আমরা কি পারি না আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ স্বদেশ গড়তে?
আইন বা সমাজ হয়তো রাতারাতি বদলাবে না, কিন্তু সহমর্মিতা কি অসম্ভব? 'বৈচিত্র্য কন্ঠ' আজ আপনার কাছে আমাদের দেশের সেই মানুষদের জন্য এক চিলতে মানবিকতা চাইছে। আমরা কি আমাদের আপনজনদের চিনতে শিখব?
পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হলো নিজের পরিবার। কিন্তু একজন সমকামী মানুষের জন্য সেই পরিবারই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের জায়গা। যে বাবা-মায়ের কোলে বড় হওয়া, তাদের কাছেই নিজের পরিচয় দেওয়াটা মনে হয় মৃত্যুতুল্য।
'কামিং আউট' বা নিজের পরিচয় প্রকাশ করা; এটি কেবল একটি কথা নয়, এটি জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়া। যেখানে বাজি ধরা হয় নিজের ঘর, নিজের সম্পর্ক আর নিজের অস্তিত্বকে। এক মুহূর্তের সত্য হয়তো সারাজীবনের বিচ্ছেদ ডেকে আনে।
আমাদের দেশে যখন কেউ সত্যটি বলে, পরিবারের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়, অস্বীকৃতি। 'তুমি ভুল করছ' 'এটি একটি শয়তানি প্রভাব' বা 'মানসিক ডাক্তার দেখানো দরকার' এই ধরণের কথাগুলো তাকে আরও বেশি কোণঠাসা করে ফেলে।
এরপর শুরু হয় 'সংশোধন' করার যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়া। জোর করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পাঠানো বা তথাকথিত 'কনভার্সন থেরাপি'র নামে মানসিক নির্যাতন; যা একজন মানুষকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
সবচেয়ে নিষ্ঠুর দৃশ্যটি দেখা যায় তখন, যখন পরিবার তাকে ত্যাজ্য করে। যে ঘরটি তাকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, সেই ঘরের দরজাই তার জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তার ধুলোয় সে খুঁজে বেড়ায় তার নতুন পরিচয়।
কিন্তু এর উল্টো চিত্রও কি হতে পারত না? যদি পরিবার তাকে বলত; 'তুমি যেমনই হও, তুমি আমাদের সন্তান। আমরা তোমার সাথে আছি'? এই একটি বাক্য কি তাকে অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে পারত না?
পরিবার মানে তো শর্তহীন ভালোবাসা। সেই ভালোবাসায় যদি 'কিন্তু' বা 'যদি' থাকে, তবে সেই সম্পর্কের গভীরতা কোথায়? 'বৈচিত্র্য কন্ঠ' আজ অভিভাবকদের কাছে একটি বিনীত প্রশ্ন রাখতে চায়; আপনার সন্তানের পরিচয় কি আপনার ইগোর চেয়েও বড়?
ভালোবাসা কখনোই ভুল নয়, ভুল হলো আমাদের সংকীর্ণতা। নিজের মানুষকে চেনার জন্য আগে নিজের মনকে বড় করা প্রয়োজন।
আমরা এই আলোচনার একদম শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। আমরা দেখেছি আইনি জটিলতা, সামাজিক দহন আর পারিবারিক বিচ্ছেদের গল্প। কিন্তু এই অন্ধকারের শেষ কোথায়? আমরা কি এভাবেই একে অপরকে ঘৃণা করে কাটিয়ে দেব?
আসলে মানবাধিকার কোনো বিলাসী শব্দ নয়, এটি প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার। আপনি কাকে ভালোবাসবেন, কার সাথে জীবন কাটাবেন; তা যদি সমাজ ঠিক করে দেয়, তবে আপনার স্বাধীনতার মানে কী?
বিশ্বজুড়ে আজ বদলের হাওয়া বইছে। বিজ্ঞান আর যুক্তির ওপর ভিত্তি করে মানুষ বুঝতে শিখছে যে, বৈচিত্র্যই প্রকৃতির সৌন্দর্য। যে সমাজ যত বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive), সেই সমাজ তত বেশি সৃজনশীল এবং শক্তিশালী।
আমাদের দেশেও ছোট ছোট আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম আজ প্রশ্ন করতে শিখছে, তারা আর অন্ধকারের আইন বা সংস্কারকে বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে রাজি নয়। এই সচেতনতাই আমাদের আগামীর ভরসা।
ভালোবাসা কোনো অপরাধ নয়। অপরাধ হলো ঘৃণা ছড়ানো, অপরাধ হলো মানুষকে তার সত্তার জন্য লজ্জিত করা। আমাদের উচিত মানুষের মেধা, চরিত্র আর তার কর্মকে শ্রদ্ধা করা, তার ব্যক্তিগত পছন্দকে নয়।
আসুন আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য এমন একটি দেশ গড়ি, যেখানে কাউকে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে ভয়ে কুঁকড়ে থাকতে হবে না। যেখানে ঘর হবে প্রকৃত নিরাপদ আশ্রয়, আর সমাজ হবে সহমর্মিতার চাদর।
ব্যক্তিগত সততা আর বুদ্ধিবৃত্তিক সাহসই পারে একটি অন্ধকার সমাজকে আলোকিত করতে। 'বৈচিত্র্য কন্ঠ' আজ আপনার কাছে কোনো বিপ্লব চাইছে না, চাইছে কেবল এক ফোঁটা উদারতা। আপনি কি তৈরি সেই উদার মনের মানুষ হতে?
মানুষ বড় নাকি তার পরিচয়, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেওয়ার দায়িত্ব আপনার। আমাদের চিন্তার এই যাত্রা চলুক একসাথে। দেখা হবে পরবর্তী কোনো আলোচনায়, ততক্ষণ পর্যন্ত, মানুষের জয় হোক।"
১৫.০৪.২৬
জুয়েল ওসমানী