08/05/2026
#ছায়ার_অভিশাপ
পর্ব-২
লেখক: Sheikh
আরিফ যখন লেন্সের ভেতর থেকে নিজের ছোট প্রতিচ্ছবিটিকে দেখতে পেল, সে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ছিল। তার ঘরের দরজা, জানালা—সবকিছুই তখন যেন লেন্সের কাঁচের মতো পাতলা হয়ে গেছে। সে অনুভব করল, তার শরীরের ওপর দিয়ে কেউ হেঁটে যাচ্ছে, কিন্তু সে কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। পায়ের ভারে মেঝেটা যেন প্রতিবার আর্তনাদ করে উঠছে।
হঠাৎ সে লেন্সের ভেতর থেকে আওয়াজ শুনতে পেল, "আরিফ, ক্যামেরাটা ফেলে দাও! লেন্সটা ভাঙো!" আরিফ চমকে উঠল। এই লেন্সটা তো সে নিজেই কিনেছে, তাহলে লেন্সের ভেতর থেকে কে তাকে ডাকছে? সে কাঁপাকাঁপা হাতে মেঝে থেকে লেন্সটা কুড়িয়ে নিল। কিন্তু লেন্সটা ধরার সাথে সাথেই সে অনুভব করল, তার হাতের চামড়া পুড়ে যাচ্ছে। লেন্সটা এখন আর কাঁচের মতো ঠান্ডা নেই, বরং আগুনের মতো গরম হয়ে গেছে।
আরিফ লেন্সটা মেঝেতে আছাড় মারল। কিন্তু আশ্চর্য! লেন্সটা ভাঙল না, উল্টো মেঝেতে লেন্সের আকারটা বড় হতে শুরু করল। মেঝেতে একটা কালো গর্ত তৈরি হলো, যা ঠিক একটা ক্যামেরা লেন্সের মতো দেখাচ্ছে। সেই গর্তের গভীর থেকে ভেসে এল হাজার হাজার মানুষের কান্নার শব্দ। আরিফ বুঝল, এই লেন্সটি কেবল কোনো কাঁচের টুকরো নয়, এটি কোনো এক অশুভ শক্তির 'চোখ', যা বছরের পর বছর ধরে মানুষের আত্মা বন্দি করে রাখছে।
সে দ্রুত ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করল। করিডোরে বেরিয়ে দেখল, দেয়ালের ছবিগুলো সব উল্টে গেছে। কিন্তু প্রতিটি ছবির মানুষের চোখগুলো যেন তাকেই অনুসরণ করছে। আরিফ সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল। নিচের তলায় নামতেই তার মনে হলো, কেউ একজন তার ঘাড়ে ফু দিচ্ছে। সে পেছনে ফিরল, কিন্তু পেছনে কেউ নেই। তবে দেয়ালের ছায়াগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, ছায়াগুলো এখন আর আরিফের শরীরের সাথে মিলছে না। ছায়াটা এখন দেয়াল থেকে আলাদা হয়ে গেছে এবং তার পেছন পেছন হেঁটে আসছে।
আরিফ দৌড়াতে শুরু করল। সে নিচে নেমে দেখল সদর দরজাটা খোলা। সে বাইরের রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে থাকল। কিন্তু যতবারই সে দৌড়ায়, সে আবার সেই একই জায়গায় ফিরে আসে। রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টগুলো একে একে নিভে যাচ্ছে। প্রতিটা নিভে যাওয়ার সাথে সাথে বাতাসের শব্দটা আরও ভারী হয়ে আসছে।
সে রাস্তার শেষ মাথায় এসে দেখল, সেই পরিত্যক্ত দোকানটি—যেখান থেকে সে লেন্সটি কিনেছিল। দোকানটা এখন আর পরিত্যক্ত নয়। ভেতর থেকে হলুদ আলো আসছে। আরিফ ভেতরে ঢুকল। দোকানের মালিক নেই, কিন্তু দোকানের কাউন্টারে রাখা অসংখ্য লেন্স। প্রতিটি লেন্সের ভেতর দিয়ে একটা করে চোখ তাকিয়ে আছে। আরিফ দেখল, দোকানের দেয়ালে তার নিজের লেন্সটার মতোই হাজার হাজার লেন্স ঝোলানো।
সে বুঝতে পারল, এটা কোনো সাধারণ দোকান নয়। এটা সময়ের এক বিশাল সংগ্রহশালা। প্রতিটি লেন্সের পেছনে একেকটা মানুষের নাম লেখা। আরিফ তার নিজের নাম লেখা লেন্সটি খুঁজছিল। হঠাৎ সে দেখল, একটা লেন্সের পেছনে লেখা— "আরিফ: পর্ব শেষ"।
ঠিক সেই মুহূর্তে দোকানটি কাঁপতে লাগল। দোকানের সব লেন্স একসাথে জ্বলে উঠল। আরিফ দেখল, দোকানের মালিকটি এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার কোনো মুখ নেই, শুধু চোখ। সে আরিফের দিকে এগিয়ে এসে বলল, "তুমি অর্ধেকটা দেখেছ, আরিফ। বাকিটা দেখার জন্য তোমাকে আমার সাথে ওই লেন্সের ভেতরেই থাকতে হবে।"
আরিফ চিৎকার করে উঠল, কিন্তু তার কন্ঠস্বর এখন দোকানের অন্য লেন্সগুলোতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সে দেখল, তার শরীরটা লেন্সের ভেতরে টেনে নেওয়া হচ্ছে—ঠিক যেভাবে আলো ক্যামেরার সেন্সরে ধরা পড়ে। সে এখন দেখছে, দুনিয়াটা লেন্সের ভেতর থেকে কেমন লাগে। সে দেখছে, লেন্সের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল ছায়ামূর্তি, যে তার ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে ছবি তুলছে। আর প্রতিটা ক্লিকে আরিফের আত্মা এক একটি স্থিরচিত্র হয়ে দেয়ালে ঝুলে যাচ্ছে।