28/09/2026
একসময় আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ গড়ে তুলেছিলাম যাকে ঘিরে, আজ সেই রাজপ্রাসাদের ভগ্নস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শুধু ধূসর ছাইটুকু হাতড়ে বেড়াচ্ছি। ভুলটা হয়তো আমারই ছিলো। যে স্বপ্নের কোনো মাটি ছিলো না, যার ওপর দাঁড়ানোর মতো শক্ত ভিত্তি ছিলো না, সেই আকাশকুসুম স্বপ্ন বুনেছিলাম দুচোখ ভরে। ভাবতাম, ভালোবাসা বুঝি পাহাড় চূর্ণ করে দিতে পারে, সময়কে থামিয়ে দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম, বড়ই করুণ। আজ বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস আর চোখের কোণে জমে থাকা শূন্যতা কেবল একটাই সত্য চিৎকার করে বলছে—স্বপ্ন দেখাটাই আমার জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো।
যে নামটা একদিন হৃদয়ের প্রতিটি রক্তকণিকায়, প্রতিটি স্পন্দনে রক্ত দিয়ে লিখে রেখেছিলাম, আজ সেই নামটা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে। অনেক সযতনে, বহু ভালোবাসার রঙে আঁকা সেই নামটি যেন বালুচরে লেখা কোনো নাম ছিলো, যা জোয়ারের এক ঝাপটাতেই মিলিয়ে গেল না-ফেরার দেশে। যে নামটি মনে করলে বুক জুড়ে শিউলি ফোটার আবহ তৈরি হতো, সেই নামটাই আজ বিষাক্ত এক কাঁটার মতো বিঁধে থাকে বুকের বাঁ পাশে। কত গভীর অনুভূতির বাঁধনে বেঁধেছিলাম তাকে! ভেবেছিলাম, পৃথিবীর সব আলো নিভে গেলেও এই নামটি হৃদয়ে প্রদীপের মতো জ্বলবে। কিন্তু অবহেলা, দূরত্ব আর নির্মম সময়ের ঘর্ষণে সেই নামও একদিন ঝাপসা হতে হতে শেষপর্যন্ত একদম মুছেই গেল। থেকে গেল শুধু খোদাই করে নাম মোছার গভীর এক ক্ষতচিহ্ন।
মাঝে মাঝে রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখন বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। জানালা দিয়ে বাইরের অমাবস্যার অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, ওই আঁধারটা তো বাইরে নয়, ওটা আমার ভেতরের শূন্যতা। যাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যি বলে মনে হতো, তার চলে যাওয়া বা বদলে যাওয়াটা যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা কেবল সেই বোঝে যার সবটুকু ভুল মানুষের কাছে গচ্ছিত ছিলো। যে প্রতিশ্রুতিগুলো ছিলো ধ্রুবতারার মতো চিরন্তন, তা কীভাবে একমুহূর্তে মেঘের মতো উবে যায়, তার হিসাব মেলাতে গিয়ে মাথা কাজ করে না। এই শহরের প্রতিটি পথ, প্রতিটি বিকেল, নদীর পারের বাতাসের প্রতিটা ছোঁয়া আজ আমাকে উপহাস করে। মনে করিয়ে দেয়, এখানে একদিন দুটো মানুষের গল্প ছিলো, যেখানে একজন নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছিল, আর অন্যজন খুব সহজে সবকিছু ভুলে গেল।
সবচেয়ে বড় হতাশার বিষয় হলো—কাউকে কোনো দোষ দেওয়া যায় না। অন্ধ বিশ্বাসে আমি নিজেই যে নিজের ফাঁদ পেতেছিলাম! সে তো কখনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার গ্যারান্টি দেয়নি, আমিই তো নিজের কল্পনার ক্যানভাসে তাকে রূপকথার রাজপুত্র কিংবা রাজকন্যা হিসেবে সাজিয়েছিলাম। হৃদয়ের গভীর থেকে যাকে এত ভালোবাসলাম, দিনশেষে জানা গেল, আমার ভালোবাসার সেই মন্দিরটি নাকি একটি বালির ঘর বৈ আর কিছুই ছিলো না। যে নাম মুছে যাওয়ার ভয়ে সারাটা জীবন আতঙ্কে থাকতাম, আজ সেটা মুছে যাওয়ার পর দেখছি পৃথিবী ঠিকই নিজের নিয়মে ঘুরে চলছে। সূর্য ঠিকই উঠছে, মানুষ হাসছে, যার জন্য আমার জীবন থমকে গেল, সে-ও হয়তো এখন নতুন কোনো গল্প লিখে চলেছে অন্য কারও হৃদয়ে। শুধু আমি থমকে গেলাম এক অসীম শূন্যতায়।
এখন আর আলো ভালো লাগে না, স্বপ্নের গল্প শুনতে ইচ্ছে করে না। যখনই কেউ ভালোবাসার কথা বলে, এক অদ্ভুত তিক্ততায় ভরে ওঠে মন। ভুল শুধরে নেওয়ারও আর কোনো উপায় নেই, কারণ মোছা নামের স্মৃতিগুলোই এখন আমার নিত্যসঙ্গী। হৃদয় আজ একটা শ্মশানের মতো, যেখানে স্বপ্নের ছাই আর একসময়ের গভীর ভালোবাসার স্মৃতির কবর জমে আছে। এ এক নিঃশব্দ কান্না, যা দেখানোর মতো কেউ নেই, বোঝার মতোও কেউ নেই। নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে গেছে। শুধু এই আত্মোপলব্ধির তীব্র বিষে প্রতিদিন তিলে তিলে জ্বলে নিঃশেষ হওয়া—স্বপ্ন দেখাটা সতাই ভুল ছিলো, ভীষণ ভুল ছিলো।
লেখায় মাহমুদ হোসেন লিটন ✍️